পুঁজিবাজারে বছরের সর্বনিম্ন লেনদেন, বিক্ষোভ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার |

একটানা দরপতনে গতকাল বছরের সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। এদিন ডিএসইতে লেনদেন হয় ২৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর আগে গত বছর ২৫শে মার্চ লেনদেন হয়েছিল ২২৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। দেশের অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। এদিকে ধারাবাহিক দরপতনের প্রতিবাদে ডিএসইর সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা জানান, প্রতিনিয়ত একের পর এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমছে। অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে গেছে অর্ধশত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। পুঁজি হারানোর আতঙ্কে ভুগছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

তারা বলেন, বাজারের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা বিনিয়োগকারীদের চরম আস্থার সংকটই ইঙ্গিত করে। নির্বাচনের পর কোনো চক্র পরিকল্পিতভাবে বাজারে এ উত্থান ঘটিয়ে এখন নীরব ভূমিকা পালন করছে কি না- তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইতে টাকার পরিমাণে লেনদেন হয়েছে ২৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার। যা ১ বছর ১৮ দিন বা ২৫১ কার্যদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৮ সালের ২৫শে মার্চ ডিএসইর লেনদেন-এর চেয়ে কম হয়েছিল। ওই দিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছেল ২২৪ কোটি টাকার। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৭ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৬১ পয়েন্টে। যা ৩ মাস ২১ দিন বা ৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্ব-এর চেয়ে কমে অবস্থান করছিল ডিএসইএক্স। ওই দিন ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ২৪২ পয়েন্টে। অপর দুই সূচকের মধ্যে শরিয়াহ সূচক ১৫ পয়েন্ট ও ডিএসই-৩০ সূচক ২২ পয়েন্টে কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১২১৭ ও ১৮৭৭ পয়েন্টে।

এদিন ডিএসইতে ৩৪৮টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিট দর বেড়েছে ৬৪টির বা ১৮ শতাংশের, শেয়ার দর কমেছে ২৩১টির বা ৬৭ শতাংশের এবং শেয়ার দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫৩টির বা ১৫ শতাংশ পতিষ্ঠানের। ডিএসইতে টাকার পরিমাণে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে গ্রামীণফোনের। কোম্পানিটির ১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকার লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে মুন্নু সিরামিক এবং ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা লেনদেনে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে ফরচুন সুজ। টপটেন লেনদেন উঠে আসা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- রেকিট বেনকিজার, ইউনাইটেড পাওয়ার, বৃটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো, ইস্টার্ন কেবলস, এস্কয়্যার নিট কম্পোজিট, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল এবং মুন্নু জুট স্ট্যাফলার্স।

অপরদিকে দেশের আরেক পুঁজিবাজার সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই এদিন ১৬৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১৪৮ পয়েন্টে। এদিন সিএসইতে হাত বদল হওয়া ২৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৫৫টির, কমেছে ১৪১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৪টির দর।

এদিকে মানববন্ধনে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ বলেন, বিএসইসির সঙ্গে ডিএসই, আইিসিবি‘র মিটিং হয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় মিটিংয়ে যেসব দাবি তোলা হয়েছে একটা দাবিও বাজারকে তার লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এসময় ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অনেক দিন ধরে বাজার নিয়ে আপনি খেলা করছেন। এই খেলা বন্ধ করেন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খায়রুল হোসেনকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সেই দায়িত্বের অবহেলা করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ইস্যুয়ার কোম্পানির দালালি করছেন। যার প্রভাবে পুরো বাজার ধংসের মুখে। বাজারের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আইপিও ও প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধের জন্য বিএসইসি’র কাছে আহ্বান জানান মিজান-উর-রশিদ।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শেয়ারবাজার পরিচালনার জন্য যেরকম দক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে রয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ দেশের শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র চেয়ারম্যান দূর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এখানে শুধুমাত্র কাগজপত্র দেখে টাকার বিনিময়ে আইপিওর অনুমোদন দিয়ে দেয়া হয়। যেখানে উচিত সরেজমিনে তদন্ত করে অনুমোদন দেয়া। তারা বলেন, দেশের অর্থনীতি এবং জনগণের জন্য শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করতে এখন প্রধানমন্ত্রীর হন্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবু আহমদ বলেন, গত সাত-আট বছরে ভালো কোনো কোম্পানি বাজারে আনতে পারেনি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এছাড়া অনেক কোম্পানি পুঁজিবাজারে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করছে, আবার অনেক কোম্পানি অযথা বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দিচ্ছে। এসব কারণে বাজারে দুর্বল শেয়ারের সরবরাহ বাড়ছে। এসব শেয়ার কিনে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অধ্যাপক আবু আহমদ বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি থাকায় মানুষ শেয়ারবাজার বিমুখ হয়ে পড়ছেন। অনেক টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। ফলে তারল্য প্রবাহ না থাকায় বাজারে দরপতন হচ্ছে।
মতামত দিন

Leave a Comment